
একেই বলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ৫৯ বছরের ব্যবধানে কার্যত তেমনই ঘটতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৬৭ সাল ছিল এক সন্ধিক্ষণ। আর ২০২৬ সাল হয়ে রইল এক মাইলফলক পরিবর্তনের বছর। আর এই দুই সময়ের মধ্যে সেতুবন্ধন করে দিলেন মেদিনীপুরের দুই ভূমিপুত্র, অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী। দুজনেই নিজের দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, দুজনেই মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর ঘরের মাঠে পরাজিত করেছেন এবং বিধানসভা ভোটে দুই আসনে জিতে বাংলার মসনদে বসার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
বাম আমল ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময়ে জেলা বরাবর উপেক্ষিত ছিল, এমনই অভিযোগ একাধিক সময়ে উঠেছিল রাজনৈতিক মহলে। শুভেন্দু অধিকারী একসময় নিজে একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী-সহ অন্যান্য মন্ত্রী সব কলকাতা ও আশপাশের এলাকা থেকে হত।গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পদ সবই কলকাতার বিজয়ী বিধায়করা পেতেন, জেলা বরাবরই উপেক্ষিত থাকত। জেলায় আন্দোলন করে ভোটে জিতে আসা বিধায়কদের বড় জোর প্রতিমন্ত্রী করা হত।এই অবস্থায় জেলা থেকে রাজ্য পরিচালনা হবে, সেই ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন শুভেন্দু। এবার সেই কথাই বাস্তব।
বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র সেন।আরামবাগের গান্ধীর সততা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না। অথচ প্রশাসক হিসেবে তিনি চরম সংকটের মুখে পড়েছিলেন। বিরোধীরা ব্যঙ্গ করে তাঁকে কাঁচকলামন্ত্রি বলতে শুরু করে।
১৯৬৭ সেই সালের সেই নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে পরাস্ত করেন অজয় মুখোপাধ্যায়।তার পর ১৫ মার্চ অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম অকংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু।
ঠিক একই ঘরানায় ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান।অজয় মুখোপাধ্যায় যেমন অবিভক্ত মেদিনীপুরের তমলুকের ভূমিপুত্র ছিলেন, শুভেন্দু অধিকারীও তাই। আবার শুভেন্দু অধিকারীও অজয়বাবুর মতই একদা সেচমন্ত্রী ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহ ঘোষণা করে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে তাঁকে হারাতে গিয়ে উল্টে পরাস্ত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এবারের ভোটে কার্যত অজয় মুখোপাধ্যায়ের পথ অনুসরণ করে দুটি কেন্দ্রে লড়েন শুভেন্দু অধিকারী। নিজের গড় নন্দীগ্রাম এবং মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক ভবানীপুর।
অজয় মুখোপাধ্যায় যেমন খাদ্য সংকটের আবেগকে হাতিয়ার করেছিলেন, শুভেন্দু অধিকারীও তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র বিরুদ্ধে হাতিয়ার করেন দুর্নীতি ও সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগকে।ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজার ৫০৫ ভোটে পরাজিত করেছেন তিনি। শনিবার শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অজয় মুখোপাধ্যায়ের সেই বিরল রেকর্ড ছুঁয়ে ফেললেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়েই মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসতে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় কোনও নেতা।
ইতিহাস বলছে, অজয় মুখোপাধ্যায়ের প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়েছিল। জোটে ভাঙন ধরায় ১৯৬৭-র নভেম্বরেই সেই সরকার বরখাস্ত হয়।পরে ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হলেও জোটের অন্তর্দ্বন্দ্বে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের সরকারের বিরুদ্ধেই রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে কার্জন পার্কে অনশনে বসেছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়।
তবে অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে সে অর্থে কোনও চ্যালেঞ্জ নেই। পশ্চিমবঙ্গে এবার বিজেপি ২০৭টি আসনে অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতে সরকার গড়তে চলেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে ভরসার পরিবেশ গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে অবশ্যই থাকবে।
এদিকে শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ মুখ।বাম আমলে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনিই। সিপিএমের গড় পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বামফ্রন্ট সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিল নন্দীগ্রাম আন্দোলন। ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য রাজনীতিতে জায়গা পোক্ত করেছিলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামের মাটিতে পরাস্ত করেছিলেন। এবার ঘরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাবেন, সেই কথা জোর গলায় দাবি করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বাস্তবেও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পতন হয়। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ২০৭টি আসন জিতে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় প্রথমবার এসেছে। সেই ইতিহাসের কাণ্ডারীও শুভেন্দু অধিকারী ।
আসলে অজয় মুখোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে মিল কেবল মেদিনীপুর বা জোড়া আসনে জয় নয়,দুজনেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি করে দীর্ঘকালীন আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছেন শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন,এটা কেবল এক ব্যক্তির জয় নয়, এটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্তও।







