
মহাসাগরের অন্ধকার ও রহস্যময় অতলগহ্বরে মানুষের পদচিহ্ন খুব সামান্যই পড়েছে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে সেই অচেনা জগতের পর্দা ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের এক যৌথ প্রচেষ্টায় সাগরের গভীরে এমন সব বিচিত্র প্রাণীর সন্ধান মিলেছে, যা মানুষ আগে কখনো দেখেনি।
কাচের দুর্গের ভেতরে বসবাসকারী এক বিশেষ ধরনের কৃমি থেকে শুরু করে মাংসাশী ‘ডেথ বল’ স্পঞ্জ কিংবা রহস্যময় ভূতুড়ে হাঙর–সব মিলিয়ে ১ হাজার ১২১টি সম্পূর্ণ অজানা নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। ওশান সেনসাস নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে এই অভাবনীয় সাফল্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বের ৮৫টি দেশের হাজারের বেশি গবেষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে মহাসাগরের মানচিত্র তৈরির এই বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় প্রাণের এক বিশাল ভাণ্ডার উন্মোচিত হয়েছে।এটি গত তিন বছরের তুলনায় বার্ষিক শনাক্তকরণের হারে প্রায় ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। জাপানের নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও যুক্তরাজ্যের মহাসাগর অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান নেকটন-এর যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা পৃথিবীর অন্যতম কম পরিচিত ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।বিগত এক বছরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে কম অন্বেষণ করা সমুদ্র অঞ্চলগুলোতে ১৩টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছেন। জাপানের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ ফুট গভীরে তারা ব্রিস্টল পলিকায়েট নামক এক বিশেষ ধরনের কৃমির সন্ধান পেয়েছেন, যা একটি গ্লাস স্পঞ্জ-এর ভেতরে বসবাস করে।এই স্পঞ্জটির কঙ্কাল সিলিকা দিয়ে তৈরি। এটি দেখতে অনেকটা স্বচ্ছ জালের মতো বা যাকে কাচের দুর্গ বলা যায়। কৃমি ও এই স্পঞ্জটির মধ্যে একটি চমৎকার মিথোজীবী সম্পর্ক বিদ্যমান। স্পঞ্জটি কৃমিকে পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি নিরাপদ আশ্রয় দেয়, বিনিময়ে কৃমিটি স্পঞ্জের গায়ের ক্ষতিকারক আবর্জনা পরিষ্কার করে দেয়। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ ফুট গভীরে সন্ধান পাওয়া গেছে এক রহস্যময় ভূতুড়ে হাঙর বা, কাইমেরা। এই মাছগুলো হাঙর ও রে মাছের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় হলেও, প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় এরা পৃথক হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে তিমুর-লেস্তে অঞ্চলে বিজ্ঞানীরা এক ইঞ্চি লম্বা উজ্জ্বল কমলা রঙের একটি রিবন ওয়ার্ম বা ফিতা-কৃমি খুঁজে পেয়েছেন। এই উজ্জ্বল রং মূলত এর ভেতরে থাকা শক্তিশালী বিষাক্ত রাসায়নিক প্রতিরক্ষার প্রতীক।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কৃমি থেকে উৎপাদিত টক্সিন বর্তমানে আলঝেইমার ও সিজোফ্রেনিয়া রোগের সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের জনমানবহীন সাউথ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জের গভীর খাঁজে প্রায় ১২ হাজার ফুট নিচে সন্ধান মিলেছে একটি মাংসাশী ডেথ বল স্পঞ্জের। এই স্পঞ্জটি সূক্ষ্ম হুকের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁটা দিয়ে আবৃত, যা অনেকটা জোড়া লাগানো টেপ, ভেলক্রোর মতো কাজ করে। যখন কোনো ক্রাস্টাসিয়ান বা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী এর পাশ দিয়ে ভেসে যায়, তখন স্পঞ্জটি সেগুলোকে আটকে ফেলে ও গিলে খায়।







