
সুরের ভুবনে অনন্ত নিঃশব্দতা। শেষ হল ভারতীয় সংগীতের এক বর্ণময়, দীর্ঘ এবং বর্ণনাতীত অধ্যায়। ৯৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে। যে কণ্ঠস্বর সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কখনও ক্যাবারের চপলতায়, কখনও রাবীন্দ্রিক গাম্ভীর্যে আবার কখনও বিরহের গভীরতায় কোটি কোটি মানুষকে বুঁদ করে রেখেছিল, সেই মায়াবী স্বর চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল।
১৯৩৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রে সংগীতের আবহে জন্ম আশার। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন ক্ল্যাসিকাল ও নাট্য সংগীতের দিকপাল। মা সেবন্তীর কোল আলো করে আসা সেজ সন্তান ছিলেন আশা। লতা, মীনা, আশা, ঊষা এবং ছোট ভাই হৃদয়নাথ,মঙ্গেশকর পরিবারের পাঁচ ভাইবোনের শৈশব কেটেছিল গোয়ার মঙ্গেশী গ্রামের মাটির ঘ্রাণ আর সংগীতের মূর্ছনায়।
কিন্তু সেই খুশির আকাশে কালো মেঘ, মাত্র ৯ বছর বয়সে আশার পিতৃবিয়োগ হয়। সংসারের হাল ধরেন বড়দি লতা। দিদির হাত ধরেই ছায়ার মতো মুম্বাইয়ের স্টুডিও পাড়ায় ঘোরাঘুরি শুরু কিশোরী আশার। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি মাঝা বাই-তে প্রথম কণ্ঠদান করেন তিনি। ১৯৪৮ সালে চুনারিয়া ছবির মাধ্যমে শুরু হয় আশা ভোঁসলের হিন্দি ছবির সফল জয়যাত্রা।
আশা ভোঁসলের জীবনকাহিনি কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের জীবনের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। দিদি লতা মঙ্গেশকরের সেক্রেটারি গণপত রাও ভোঁসলের প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়েছিলেন কিশোরী আশা ভোঁসলে। ৩১ বছরের প্রৌঢ় গণপত ছিলেন উচ্চবংশীয় এবং বিত্তবান। এই বিয়ে মঙ্গেশকর পরিবার মেনে নেয়নি, যার ফলে দীর্ঘ সময় দিদি লতার সঙ্গে তাঁর মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল। এই সম্পর্ক থেকে তাঁর জীবনে এসেছিল তিন সন্তান, হেমন্ত, বর্ষা এবং আনন্দ। গণপতই, লতার বাতিল করা গানগুলোর সুযোগ আশাকে করে দিতেন, যা তাঁর পেশাদারি জীবনের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু সাত বছর পর সেই সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং আশাকে তিন সন্তান নিয়ে ঘর ছাড়তে হয়।
গণপতের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আশা ভোঁসলের জীবনে বসন্ত হয়ে আসেন ওঙ্কারপ্রসাদ নায়ার বা ওপি নায়ার। ওপি-র সুর আর আশার কণ্ঠ মিলে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করে। নয়া দৌড়, মেরে সনম, হাওড়া ব্রিজ-এর মতো একের পর এক হিট ছবি আশাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়। ওপি নায়ারের সঙ্গে তাঁর প্রেম নিয়ে মুম্বাই তখন সরগরম। বলা হয়, ওপি-র লকেট শাড়ির ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরতেন আশা। কিন্তু দশ বছরের সেই লিভ-ইন সম্পর্কও টেকে নি ব্যক্তিগত তিক্ততায়।
এরপরেই আশার জীবনে প্রবেশ রাহুল দেব বর্মণ বা পঞ্চমের। বয়সে আশার থেকে ছ’বছরের ছোট পঞ্চমই ছিলেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী।তিসরি মঞ্জিল থেকে শুরু করে ১৯৪২ লাভস্টোরি, আশা-পঞ্চম জুটি সংগীতকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে তাঁদের পরিণয় পূর্ণতা পায়। মাঝে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলেও, ১৯৯৪ সালে পঞ্চমের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন একে অপরের প্রিয়,বাবস।
রাহুল দেব বর্মণ বা পঞ্চমের সূত্রে,মারাঠি মেয়ে হয়েও আশা ভোঁসলে ছিলেন বাঙালির পরম আপন। তাঁর উচ্চারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত কখনও মনে হতে দেয়নি যে বাংলা তাঁর মাতৃভাষা নয়। জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ বা, এসো শ্যামল সুন্দর শুনে আপ্লুত হয়েছে আপামর বাঙালি।
আর এক সময়,পুজোর প্যান্ডেল মানেই ছিল আশার সেই অমোঘ কণ্ঠ, চোখে চোখে কথা বলো বা, মাছের কাঁটা খোপার কাঁটা। সুধীন দাশগুপ্ত ও নচিকেতা ঘোষের সুরে তাঁর গাওয়া আধুনিক গানগুলো আজও বাঙালির ড্রয়িংরুমের সম্পদ।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন ভাষায় অজস্র চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের জন্য অসংখ্য গান রেকর্ড করেছেন এবং বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, ২০০৮ সালে পেয়েছেন পদ্মভূষণ। এ ছাড়া, ১৯৯৭ সালে গ্র্যামির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে অন্যতম, দিল তো পাগল হ্যায়, এক পরদেশী মেরা দিল লে গয়া, তুমসে মিলকে ইত্যাদি।
আর বাস্তব ছিল,সারা জীবন দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর তুলনা চলেছে। লতা ছিলেন স্নিগ্ধ ধ্রুপদী সুরের প্রতীক, আর আশা ছিলেন আগুনের ফুলকি। ক্যাবারে, পপ থেকে শুরু করে ক্ল্যাসিকাল, সব ঘরানাতেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শাড়ি পরেও যে পারফরম্যান্সের আগুন জ্বালানো যায়, তা আশা ভোঁসলে ছাড়া আর কেউ শিখিয়ে যাননি। তাঁর জীবনে এসেছে অনেক শোক,মেয়ে বর্ষার আত্মহত্যা, বড় ছেলে হেমন্তর ক্যানসারে মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল,কিন্তু দমিয়ে দিতে পারেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি ছিলেন উচ্ছ্বল, হাসিমুখ।
সেই খিলখিল হাসির মানুষটি চলে গেলেন। আশা ভোঁসলে রেখে গেলেন আট দশকের গান, হাজার হাজার রেকর্ড আর একরাশ স্মৃতি। সংগীতের আকাশ থেকে খসে পড়ল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর রয়ে গেল মহাকালের পাতায়, অবিনশ্বর, অমর।








