
পড়শি রাজ্য হরিয়ানায় গত বছর বিধানসভা ভোটের আগে জাঠ সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। এ বার সেই বিতর্ক দেশের রাজধানী দিল্লিতে।ঘটনাচক্রে, বিধানসভা ভোটের আগেই।দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আম আদমি পার্টি,আপ-র নেতা অরবিন্দ কেজরীওয়াল বিজেপির বিরুদ্ধে দিল্লির জাঠদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার জাঠদের ওবিসি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি তালিকাভুক্ত না করার ফলেই তাঁরা সংরক্ষণের কোনও সুবিধা পাচ্ছেন না।
৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে এক দফায় বিধানসভার ৭০টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। ৮ ফেব্রুয়ারি হবে গণনা। সেখানে ক্ষমতাসীন আপের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি। ২০১৬ সালে হরিয়ানায় জাঠ আন্দোলনের পরে সে রাজ্যের বিজেপি সরকার পৃথক সংরক্ষণের সুবিধা ঘোষণা করলেও আদালতের নির্দেশে তা বাতিল হয়ে গিয়েছিল।যদিও রাজস্থানে জাঠেদের জন্য সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে। মনে করা হচ্ছে,সে কথা মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে জাঠেদের কেন্দ্রীয় ভাবে ওবিসি তালিকাভুক্ত না করার বিষয়টি উস্কে দিতে চেয়েছেন কেজরী।
অরবিন্দ কেজরীওয়াল বলেছেন, রাজস্থানের জাঠেরা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর কলেজে ভর্তি হতে পারেন, এমস, সফদরজং হাসপাতাল এবং সমস্ত কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থায় চাকরি পেতে পারেন। কিন্তু দিল্লির জাঠেরা নয়। কারণ, তাঁদের কেন্দ্রীয় ভাবে ওবিসি তালিকাভুক্ত করা হয়নি। অন্য দিকে, আপের বিরুদ্ধে বিজেপির তোলা বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের মদত দেওয়ায় অভিযোগের জবাব দিয়েছেন কেজরী ঘনিষ্ঠ সাংসদ সঞ্জয় সিংহ। তিনি বলেছেন,শুরু দিল্লি নয়, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গারা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ছেন। বিজেপির মদতেই এমন ঘটছে। কারণ, সীমান্তের সুরক্ষার ভার কেন্দ্রের হাতে।
উল্লেখ্য এর আগে,দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আপ সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে দলের জন্য আপদ বলে কটাক্ষ করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ২৪ ঘণ্টা কাটার আগেই তাঁকে তীব্র কটাক্ষ ফিরিয়ে দিয়েছেন কেজরিওয়াল। বস্তিবাসীদের বাড়ি তৈরি নিয়ে অমিত শাহ মিথ্যাচারিতা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।দিল্লির বস্তিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একহাত নিয়ে কেজরিওয়াল বলেছেন, অমিত শাহ যেভাবে দিল্লির বস্তিবাসীদের কাছে মিথ্যা বলেছেন এবং বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন, এখন সেই মিথ্যাকে ফাঁস করতে এই বস্তি শিবিরে এসেছেন। কেজরিওয়ালের হিসাব দিল্লিতে ৪ লাখ ঝুগ্গি রয়েছে। যদি গত ১০ বছরে ৪ হাজার ৭ শো বাড়ি তৈরি করা হয়, তবে দিল্লির প্রতিটি বস্তিবাসীকে বাড়ি দিতে এক হাজার বছর সময় লাগবে।
প্রসঙ্গত, দিল্লির বস্তির একটি জনসভা থেকে কেজরিওয়াল এবং তাঁর দল আপকে তীব্র নিশানা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন,বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে আপ দ্বিচারিতা করেছে। বাসিন্দারা অতীতে আপকে সমর্থন করেছিল। তারপরেও ঝুপড়ির বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলি ভেঙে দেওয়ার কথা বলছে আপ। শুধু তাই নয়, আপ প্রচার করে বেড়াচ্ছে বিজেপি জিতলে সমস্ত কল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে।এরপরেই অমিত শাহ আশ্বাস দিয়েছেন, ঝুপড়ি যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। শুধু তাই নয়, বস্তিবাসীদের পাকা ঘর বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন অমিত শাহ। এছাড়াও তাঁর আশ্বাস, দরিদ্রদের জন্য কোনও কল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ হবে না।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কটাক্ষ, আসলে কেজরিওয়ালের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে দিল্লিবাসীদের কাছে অনেক পরিষেবা পৌঁছয়নি।
অন্যদিকে বিধানসভা ভোটের আগে দিল্লিতে আম আদমি পার্টি,আপ সরকারের জমানায় আবগারি লাইসেন্স বণ্টন সংক্রান্ত নীতিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া সিএজি রিপোর্টে। সেই রিপোর্টে দাবি,এর ফলে দিল্লি সরকারের অন্তত ২ হাজার ২৬ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।স্বভাবতই দিল্লির বিধানসভা ভোটের আগে এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে আপ সরকারকে নিশানা করেছে বিজেপি। অন্য দিকে আপের দাবি,পরিকল্পিত ভাবে বিভানসভা ভোটের আগে এই বিজেপি এই রিপোর্ট ফাঁসের ঘটনা ঘটিয়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির বিধানসভা ভোটের আগে রিপোর্ট ‘ফাঁসে’র ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতর নতুন মাত্রা পেয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২১-২২ সালে দিল্লির আবগারি নীতি বদল করেছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়ালের সরকার। ২০২১ সালের নভেম্বরে তা কার্যকর হয়েছিল। ফাঁস হওয়ায় সিএজি রিপোর্ট বলছে,দিল্লির তৎকালীন উপমুখ্যমন্ত্রী তথা আবগারি মন্ত্রী মণীশ সিসৌদিয়া বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে নতুন আবগারি নীতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।প্রসঙ্গত, দিল্লির উপরাজ্যপাল (লেফটেন্যান্ট গভর্নর) ভিকে সাক্সেনা ২০২২ সালের জুলাই মাসেই অভিযোগ করেছিলেন, নতুন আবগারি নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে। নতুন আবগারি নীতি কার্যকরের ক্ষেত্রে অসম্মতি জানানোর পাশাপাশি তিনি এ বিষয়ে সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করেছিলেন।সে সময় দিল্লির মুখ্যসচিব একটি রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছিলেন, সেখানে মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। মদের ব্যবসায়ীদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিতর্কের জেরে সিসৌদিয়া জানান, যত দিন না নতুন আবগারি নীতি চালু হচ্ছে, তত দিন পুরনো নীতি মেনে চলা হবে। আপ প্রধান তথা দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কেজরীওয়াল সে সময়ই অভিযোগ তুলেছিলেন, উপরাজ্যপালের হস্তক্ষেপের কারণে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে দিল্লি সরকার।নীতি বদলে অনিয়ম নিয়ে ইতিমধ্যেই চার্জশিট জমা দিয়েছে সিবিআই।
সব মিলিয়ে গত দুবারের মত এবারের দিল্লির ভোটে ফ্যাক্টর সেই অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তা তিনি তখতে থাকুন বা না থাকুন !








