
আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার স্ক্রিন। কিন্তু এই প্রযুক্তি নির্ভরতার আড়ালে নীরবে বাড়ছে এক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এর নাম চোখের শুষ্কতা বা ড্রাই আই সিন্ড্রোম। বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা একটি চোখের সমস্যায় পরিণত হয়েছে এটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় কেরাটোকনজাংটিভাইটিস সিক্কা।এটি তখনই দেখা দেয় যখন চোখ পর্যাপ্ত অশ্রু তৈরি করতে পারে না বা তৈরি হওয়া অশ্রু ঠিকভাবে কাজ করে না। আমেরিকায় এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ। যা প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬.৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন আর কেবল একটি চিকিৎসাগত সমস্যা নয়,বরং আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি লাইফস্টাইল ডিস-অর্ডার। আসলে,চোখের অশ্রু শুধু জল নয় বরং তিন স্তরের একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। তেল, জল ও মিউকাস—এই তিন স্তর একসঙ্গে কাজ করে চোখকে আর্দ্র ও পরিষ্কার রাখে।কিন্তু এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই শুরু হয় চোখ শুকিয়ে যাওয়ার রোগ শুরু হয়।প্রথম স্তরটি হলো তেল বা লিপিড স্তর, যা চোখের পাতার প্রান্তে থাকা মেইবোমিয়ান গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়। এটি অশ্রুকে দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। দ্বিতীয়টি হলো জলের স্তর, যা ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে তৈরি হয়ে চোখকে আর্দ্র রাখে এবং ধুলোবালি ও জীবাণু পরিষ্কার করে। তৃতীয়টি হলো মিউকাস স্তর, যা কনজাংটিভা থেকে তৈরি হয়ে অশ্রুকে চোখের পৃষ্ঠে ছড়িয়ে দেয় এবং স্থিতিশীল রাখে।এই তিন স্তরের যেকোনো একটির ভারসাম্য নষ্ট হলেই চোখের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ড্রাই আই-এর লক্ষণ দেখা দেয়।এদিকে,ড্রাই আই সিন্ড্রোমের সবচেয়ে জটিল দিক হলো এর ধীরে ধীরে এর লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকেই শুরুতে বিষয়টিকে সাধারণ ক্লান্তি বা সাময়িক অস্বস্তি মনে করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।চিকিৎসকদের ভাষায়, রোগীরা প্রায়ই চোখে বালুকণার মতো অনুভূতি, জ্বালাপোড়া, খোঁচা লাগার মতো ব্যথা, চোখ ভারী লাগা কিংবা দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখ খোলা রাখতে কষ্ট হওয়ার কথা জানান। অনেক ক্ষেত্রে চোখে চাপ বা তীব্র ব্যথাও অনুভূত হয়। ওদিকে,চোখে দেখার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়,ঝাঁপসা দেখা এবং আলোতে তাকাতেও অস্বস্থি হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক সময় চোখে অতিরিক্ত জল পড়াও ড্রাই আই-এর একটি লক্ষণ। কারণ শুষ্কতার জ্বালায় চোখ অতিরিক্ত অশ্রু উৎপন্ন করে।এছাড়া চোখের পাতায় প্রদাহ, কাঁপুনি, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পাপড়িতে জমাট বাঁধা বা ময়লা জমে থাকা—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। এখন প্রশ্ন হলো মোবাইলের স্ক্রীন কি ভাবে শুষ্ক করে চোখ ? চিকিৎসকদের মতে, আধুনিক সময়ে ড্রাই আই বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার। মোবাইল, কম্পিউটার বা গেমিংয়ের সময় মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম পলক ফেলে। এতে চোখের উপরিভাগ দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং অশ্রুর স্বাভাবিক স্তর ভেঙে পড়ে।
দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিনে কাজ করা ছাড়াও কম ঘুম, মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাও চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। ফলে চোখ ধীরে ধীরে তার প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়।
