ভারত ও আমেরিকার চুক্তি – পরোক্ষে প্রতিবেশীদের ওপরে চাপ 

0
19

ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যা দ্বিপাক্ষিক বিষয়, এতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। মার্কিন বিদেশসচিব মাইক পম্পেওকে পাল্টা বার্তা দিয়েছে বেজিং। এক বিবৃতিতে চিন জানিয়েছেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় স্থিতাবস্থা ফেরাতে এবং সেনা সরাতে দু’ দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে। উভয় দেশরই সীমান্ত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রয়েছে। সেখানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের কোনও প্রয়োজন নেই।অভিযোগ উঠেছে,শুধুমাত্র ভারতীয় উপমহাদেশে কর্তৃত্ব বিস্তারের জন্যই আমেরিকা লাদাখ সীমান্ত ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে।দু’ দেশের লড়াইয়ের মধ্যে সুবিধা এবং আধিপত্য প্রকাশের সুযোগ খুঁজছে তারা।

ভারতের সঙ্গে টু প্লাস টু বৈঠকে যোগ দিতে ভারতে এসেছিলেন মার্কিন বিদেশসচিব মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক টি এসপার।এরপর নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠকের পরে মাইক পম্পেও বলেছিলেন,ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ওয়াশিংটন সব সময়ই পাশে থাকবে নয়াদিল্লির। যে কোনও বিপদে একসঙ্গে কাজ করবে দুই দেশ।

এদিকে স্বাধীনতার পর এই প্রথম বড় ধরনের প্রশাসনিক ভোল বদল ঘটতে চলেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর।ঢেলে সাজছে ফৌজ,পালটে ফেলা হচ্ছে এতদিনকার পরিকাঠামোগত এবং প্রশাসনিক বিন্যাস। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বড় ধরনের প্রশাসনিক ভোল বদল ঘটতে চলেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর।প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কোনও কসমেটিক চেঞ্জ নয়। একেবারে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর পরিকাঠামোগত চেহারাটাই বদলানো হচ্ছে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে। এজন্য আমেরিকা ও চিনের ধাঁচে গড়া হচ্ছে ৫টি থিয়েটার কমান্ড।এর মধ্যে দু’টি কমান্ড হবে খুব নির্দিষ্টভাবে চিন ও পাকিস্তান কেন্দ্রিক।কারণ এই দুই চেনা শত্রু আগের থেকে অনেক বেশি আগ্রাসী হয়েছে।চিন ও পাকিস্তান হাতে হাত মিলিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নাশকতায় শামিল।

সেনাবাহিনীর নিজস্ব সমীক্ষা, যে কোনও সময় দীর্ঘমেয়াদে এই দুই প্রতিবেশী শত্রুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে ভারতের তিন বাহিনীকে লড়তে হতে পারে। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই লড়াই চলতে পারে বহু বছর ধরে। যেমনভাবে কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদ ও চিনা সম্প্রসারণবাদের মোকাবিলা করছে ভারত। তাই সময় এসেছে সেনাবাহিনীর কাজকর্ম আরও নিখুঁত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার। সরকার চায়, স্থলসেনা, বায়ুসেনা ও নৌসেনার মধ্যে বোঝাপড়া যেন চব্বিশ ঘণ্টা মসৃণ থাকে।সেই লক্ষ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সারা বছর সক্রিয় থাকবে ভারতীয় সেনার নতুন,ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড। চিনের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকবে নর্দার্ন থিয়েটার কমান্ড। বাকি তিন কমান্ড সামলাবে দেশের বাকি তিন অংশের নিরাপত্তা। এই পাঁচ কমান্ড তৈরির দায়িত্বে থাকছেন সেনা সর্বাধিনায়ক ,চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াত। ২০২২ সালের মধ্যে এই কমান্ডগুলি তৈরি হয়ে যাবে।

সেনা সদর দপ্তর সূত্রে খবর, চিনের মোকাবিলা করার জন্য তৈরি হচ্ছে নর্দার্ন থিয়েটার কমান্ড। নর্দার্ন কমান্ডের আওতাধীন এলাকা শুরু হবে লাদাখের কারাকোরাম গিরিপথ থেকে অরুণাচল প্রদেশের কিবিথু আউটপোস্ট পর্যন্ত। বাহিনীর এই বিভাগের দায়িত্বে থাকবে চিন সীমান্তের মোট ৩হাজার ৪৮৮ কিমি দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা।বিভাগীয় সদর দপ্তর থাকছে লখনউতে। পাকিস্তানের মোকাবিলার জন্য ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের দায়িত্বে থাকছে সিয়াচেন হিমবাহ অঞ্চলের সালতোরো গিরিখাতে ইন্দিরা কল থেকে গুজরাটের রান ও কচ্ছ-এর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত।এর বিভাগীয় সদর দপ্তর থাকছে সম্ভবত জয়পুরে। এ ছাড়া থাকছে তৃতীয় থিয়েটার কম্যান্ড ,পেনিনস্যুলার কমান্ড। সদর দপ্তর কেরলের তিরুবনন্তপুরমে। দক্ষিণ ভারতের ও মধ্য ভারতের নিরাপত্তা দেখবে এই কমান্ড।চতুর্থটি পুরোদস্তুর বায়ুসেনার নিজস্ব থিয়েটার কমান্ড ও পঞ্চমটি পুরোদস্তুর নৌসেনা কমান্ড। এটি সম্পূর্ভাবে আন্দামান নিকোবর কেন্দ্রিক।গোটা ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর এলাকায় ভারতীয় সেনার আধিপত্য বজায় রাখবে এই কমান্ড।

তবে এই মূহূর্তে সেনার কলকাতার পূর্বাঞ্চলীয় সদর দফতর ফোর্ট উইলিয়ামের গুরুত্ব পরে বাড়বে না কমবে তা নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।এই প্রশাসনিক বিন্যাসের জেরে কলকাতার ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়ামের ভূমিকা কি হবে তা নিয়েও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনী,ভারতীয় বায়ুসেনা ও ভারতীয় নৌসেনা সম্মিলিত ভাবে দেশের আকাশসীমা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে।অথচ প্রতিটি ভারতীয় সেনা বিভাগের প্রধান দফতরই কোনও না কোনও বায়ুসেনা ঘাঁটির কাছাকাছি রয়েছে।এর ফলে একই দায়িত্বে থাকছে একাধিক বিভাগীয় বাহিনী, যার জেরে বাড়ছে অনাবশ্যক খরচ।এই অপ্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করতে এবং বাহিনীর কাজকে আরও সুসংহত করতেই ব্যাপক সংস্কার করছে প্রতিরক্ষামন্ত্রক।

এই অবস্থায় ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একযোগে কাজ করার আশ্বাস,ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকার এমন পদক্ষেপে চটেছে চিন। আমেরিকাকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে নয়াদিল্লিতে চিনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে,ভারত-চিন সীমান্ত সমস্যায় তৃতীয় পক্ষ-এর কোনও জায়গা নেই।ভারতীয় উপমহাদেশে আমেরিকা নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে চাইছে বলেও তোপ দেগেছে  চিন।

এর আগে মঙ্গলবার প্রথমে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আমেরিকার বিদেশ সচিব মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক টি এসপার।সেখানে সামরিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দু’দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।তার পর তাঁরা বৈঠকে বসেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভালের সঙ্গে। এনএসএ-র সঙ্গে বৈঠকে পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারত-চিন উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।এর পরে আমেরিকার বিদেশ সচিব মাইক পম্পেও ভারতের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে চিনকে নিশানা করে বলেছেন, ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ওয়াশিংটন সব সময়ই পাশে থাকবে নয়াদিল্লির। যে কোনও রকমের বিপদ থেকে রক্ষা করতে একযোগে কাজ করবে দু’ দেশ।

এর আগে ভারত আমেরিকার সঙ্গে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিসোমিয়া), লজিস্টিক সাপোর্ট অ্যাগ্রিমেন্ট (এলএসএ) ও কমিউনিকেশনস ইন্টারোপেরাবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি মেমোরেন্ডাম অব অ্যাগ্রিমেন্ট (সিসমোয়া) সই করেছিল। বেকাসহ ওই তিনটি চুক্তিকে আমেরিকার যেকোনো দেশের সঙ্গে নিবিড় সামরিক সম্পর্কের কাঠামো চুক্তি হিসেবে ধরা হয়। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়,বেকা চুক্তিকে। এই চুক্তির আওতায় যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে তা নির্ভুলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য লক্ষ্যে আঘাত হানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও নিবিড় সামরিক সম্পর্ক গড়তে আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকেও,জিসোমিয়া এবং অ্যাকুইজিশন ও ক্রস সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট (আকসা) সইয়ে প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেগুলো চূড়ান্ত করতে পারেনি।

ভারত ও আমেরিকা বেকা ছাড়াও আরো চারটি চুক্তি সই করেছে।এগুলো হলো আর্থ সায়েন্সেস বিষয়ে কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি, পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক ব্যবস্থা সম্প্রসারণে চুক্তি, পোস্টাল সার্ভিসেস চুক্তি এবং আয়ুর্বেদ ও ক্যান্সার গবেষণায় সহযোগিতা চুক্তি।বৈঠকের পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারত-আমেরিকা সামরিক সহযোগিতা অনেক ভালোভাবে এগোচ্ছে। যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির বিষয়েও প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে।আলোচনা হয়েছে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়েও। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সক্ষমতা সৃষ্টি এবং এর বাইরেও ভারত-আমেরিকা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সব দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র এলাকায় ,ফ্রিডম অব নেভিগেশন ও আইনের শাসনের বিষয়ে ভারত ও আমেরিকা একমত হয়েছে।

এখন ঘটনা হল,গত বছর আমেরিকা ও ভারত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারি জোরদার করেছে। দু’ দেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে তথ্য বিনিময় করছে। এটি উন্মুক্ত, স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিকের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সক্ষম হবে।বেজিংয়ের অভিযোগ,ভারতীয় উপমহাদেশে কর্তৃত্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এ ভাবে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে আমেরিকা।উপমহাদেশের দেশগুলির মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে তার ফায়দা তুলতে চাইছে হোয়াইট হাউস। একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য জাহির করতে চাইছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কখনও তৃতীয় পক্ষের স্বার্থে হওয়া উচিত নয় বলেও বিবৃতিতে মন্তব্য করেছে চিন।