নেপাল : প্রতিবেশী সম্পর্কে নতুন মোড় 

0
46

Last Updated on by

উত্তরাখণ্ডের তিন ভারতীয় এলাকা নেপালের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শনিবার নেপালের হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভের নিম্নকক্ষে নতুন মানচিত্র অনুমোদনের সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ হয়েছে।

ভারতের আপত্তি উড়িয়ে তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ভারতীয় এলাকা লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখকে। চিন অধিকৃত তিব্বত লাগোয়া পিথোরাগড় জেলার ওই তিনটি অঞ্চল সামরিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরেই লিপুলেখ গিরিপথ কৈলাস ও মানস সরোবরের তীর্থযাত্রীরা ব্যবহার করেন। গত মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ তাওয়াঘাট-লিপুলেখ সড়কের উদ্বোধন করেছিলেন।বস্তুত, এর পরেই ৩১ মে নেপালের আইনমন্ত্রী শিবমায়া তুম্বাহাম্পি হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভে মানচিত্র-বদল বিলের খসড়া পেশ করেন। ভারতের দখল থাকা ওই তিন এলাকা দেশের মানচিত্র আগেই স্থান দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী ওলি-র নেতৃত্বে সরকার।সংসদে তা পাসও হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু মানচিত্র সংশোধনের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল।ভারত বরাবরই বলে আসছে, নতুন মানচিত্র নিয়ে নেপাল যা করছে তা একবারেই একতরফা।এর সঙ্গে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণের কোনও যোগ নেই। মূলত কালি নদীর উত্তর-পূর্ব এলাকা বিতর্কিত।ভারতের দাবি,ওই এলাকার লিপুলেখ পাস উত্তরাখণ্ডের।পাশাপাশি লিম্পিয়াধুরা আর কালাপানি এলাকা ১৯৬২ থেকে ভারতের সীমানার অংশ। বরাবর দাবি করেছে ভারত,কিন্তু সংশোধিত মানচিত্রে এই এলাকাগুলি নিজের বলে দাবি করছে নেপাল।

নেপালে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে অনুমোদন দেওয়া সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাশের জন্য প্রয়োজন ছিল দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন।শাসকদল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেস এমনকি, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীয় নেপালি দলগুলিও বিল সমর্থন করেছে। বিলের পক্ষে পড়েছে ২৫৮টি ভোট।এদিকে,বিহারের সীতামঢ়ীতে নেপাল পুলিশের গুলিতে ভারতীয় কৃষকের মৃত্যুর ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকারের এই পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক কাঠমান্ডুর এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেছেন, কৃত্রিমভাবে এলাকা বাড়িয়ে নেওয়ার এমন দাবি ভারতের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, নেপালের এই আচরণ একতরফা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের পরিপন্থী। নেপাল পার্লামেন্টে ভোটাভুটির আগে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মানচিত্র বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নরবণে। তিনি বলেছেন,ভারত এবং নেপালের সম্পর্ক অতীতেও ঘনিষ্ট ছিল,ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ দু দেশের ভৌগলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় যোগসূত্র রয়েছে।

কয়েকদিন আগে নেপালের হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভের নিম্নকক্ষের সদস্য সরিতা গিরি নতুন বিলের বিরুদ্ধে একটি সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। তাতে একতরফা ভাবে মানচিত্র বদলের পরিবর্তে উত্তরাখণ্ড সীমান্তের ওই তিনটি বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্পিকার অগ্নিপ্রসাদ সাপকোটা সংবিধানের ১১২ ধারা অনুযায়ী নিজের বিশেষ অধিকার প্রয়োগ করে প্রস্তাবটি খারিজ করে দেন।ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীয় নেত্রী সরিতার বাড়িতেও চিন-ঘনিষ্ঠ নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা হামলা চালায়।পরিস্থিতির আঁচ পেয়ে সরিতার দল জনতা সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বও তাঁকে না-এগোনোর নির্দেশ দেন। এর মধ্যে ৯ জুন প্রতিনিধিসভা সবর্সম্মতিক্রমে বিলটি বিতর্ক ও ভোটাভুটির জন্য গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকারের এমন পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এখন ঘটনা হলো ,প্রথমে লাদাখ নিয়ে চীনের সঙ্গে , তারপর উত্তরাখণ্ডের সীমান্তে নেপালের সঙ্গে ভারতের বিবাদে সেই ড্রাগনের চেহারাটা স্পষ্ট হচ্ছে। সীমান্তে চীনের সঙ্গে বৈঠকে দেশের সেনা প্রধান যতই সন্তোষ প্রকাশ করুন না কেন ,এই উপমহাদেশে করোনার এই ভয়াবহ বিপদের মধ্যে বদলে যাচ্ছে দ্বি পাক্ষিক সম্পর্কগুলোও। সেটাই বেশি আতঙ্কের।কারণ ,ভুটানের মতো নেপাল ,ভারতের সহজাত মিত্র বা বন্ধু বলে মনে করা হতো। যে কারণে, পঞ্চাশের দশক থেকে ভারত এবং নেপাল সরকার পরস্পরের সেনাপ্রধানকে নিজের দেশের সাম্মানিক সেনাপ্রধান পদে নিযুক্ত করে। গত বছর নেপালের সেনাপ্রধান পূর্ণচন্দ্র থাপাকে ভারতীয় ফৌজের সাম্মনিক জেনারেল পদ প্রদান করা হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল বলে মনে করা হচ্ছে।