
একদিকে আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক-সংঘাত। অন্য দিকে চিনের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্যিক ঘাটতি। ঘরোয়া উৎপাদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে একগুচ্ছ সমস্যা। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বেশির ভাগ দেশের তুলনায় ছুটছে ভারতের অর্থনীতি। এ বার নতুন বছরে বৃদ্ধির সূচক নিয়ে আশার পূর্বাভাস দিয়েছে ,আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং। তাদের দাবি, স্বাধীনতার ১০০ বছরে, ২০৪৭-’৪৮ অর্থবর্ষে ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে নয়াদিল্লি। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
নতুন বছরে ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং। সেখানে বলা হয়েছে,বছরে গড়ে ছ’শতাংশ বৃদ্ধির হার বজায় রেখেও ২৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছোতে পারবে নয়াদিল্লি। আর্থিক বৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি বাড়বে মাথাপিছু গড় আয়। সেটা একলাফে ১৫ হাজার ডলার বা তার বেশি হতে পারে, যা বর্তমানের প্রায় ছ’গুণ বলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষক সংস্থা,আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং মনে করে ২০৩০ সালের মধ্যেই চিন এবং আমেরিকার পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে ভারত।বর্তমান অবস্থা বজায় থাকলে অচিরেই জার্মানিকে ছাপিয়ে যাবে নয়াদিল্লি। চলতি আর্থিক বছরের শেষে এ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি,গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট পৌঁছোবে প্রায় ৪.১ থেকে ৪.৩ লক্ষ কোটি ডলারে, গত ১০ বছরের নিরিখে যা দ্বিগুণ। ২০১৫ সাল নাগাদ ভারতের জিডিপির পরিমাণ ছিল ২.১ লক্ষ কোটি ডলার।
আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা, আইএমএফ বলছে হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নয়াদিল্লির বৃদ্ধির সূচক ৬.৫ শতাংশের নীচে যাবে না।উল্লেখ্য গত বছরই জাপানকে ছাপিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ক্রমতালিকায় চতুর্থ স্থানে উঠে আসে ভারত।আইএমএফের অনুমান, ২০২৮ সালের মধ্যে এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে তিন নম্বরে থাকা জার্মানি।
এর আগে গত বছরের এপ্রিলে পারস্পরিক শুল্ক নীতি চালু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ওই সিদ্ধান্তের পর কার্যত ওয়াশিংটনের শুল্কবাণের মুখে পড়ে নয়াদিল্লি। আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত কিন্তু সে ভাবে এ দেশের অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। সরকারি তথ্যেই মিলেছে তার প্রমাণ। কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২৫-’২৬ চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ,জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২ শতাংশ, যা যে কোনও আর্থিক বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠানের অনুমানের চেয়ে অনেকটাই বেশি।
বিশ্লেষকদের দাবি, বিপুল জনসংখ্যার কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পরিষেবা খাতে আর্থিক গতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে ভারত। বেসরকারি সংস্থাগুলিও বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিচ্ছে। সেখানে একটা স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে তারা। এ দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হল ভারতের বিপুল বাজার। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন শুল্কনীতির চ্যালেঞ্জ সেই চাহিদায় এতটুকু ফাটল ধরাতে পারেনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ব্যক্তিগত চূড়ান্ত খরচ বা পিইসিই ,প্রাইভেট ফাইনাল কনজ়াম্পশান এক্সপেনডিচার প্রায় ৭.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য মাথায় রেখে যথেষ্ট খরচ করতে পারছে এ দেশের প্রায় সমস্ত পরিবার। সেইমতো প্রয়োজনীয় টাকাও রয়েছে তাদের হাতে। ঊর্ধ্বমুখী আছে উৎপাদন এবং নির্মাণক্ষেত্রের বৃদ্ধির সূচকও।
অন্যদিকে,ভারতের ক্ষেত্রে উৎপাদন এবং নির্মাণ অর্থনীতির মধ্যম খাত হিসাবে বিবেচিত। বর্তমানে সেখানে ৮.১ শতাংশের বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে, যা রেকর্ড। বিশেষত উৎপাদন ক্ষেত্রের সূচক ৯.১ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে দিন দিন বাড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ। ফলে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে সর্বদা দৃষ্টি দিতে হচ্ছে সরকারকে। এর জেরে দু’দিক দিয়েই তৈরি হচ্ছে বিপুল কর্মসংস্থান।
এদিকে এ দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হল পরিষেবা। সেখানে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৯.২ শতাংশে ঘোরাফেরা করছে। এর মধ্যে আবার রিয়্যাল এস্টেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো পেশাদার পরিষেবা খাতে সূচক বেড়েছে ১০.২ শতাংশ। এটি শুধুমাত্র ঘরোয়া বাজারেই কর্মসংস্থান তৈরি করছে এমনটা নয়। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গেও এটি গভীর ভাবে জড়িত।
বর্তমানে ভারতে আছে প্রায় ১,৫০০ গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার .জিসিসি, যেটা সারা দুনিয়ার মোট সংখ্যার ৪৫ শতাংশ। এটি নয়াদিল্লির হাতে যে দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে, সেই তথ্যই প্রকাশ করে। এ দেশের টেলিকম এবং ইন্টারনেট ইউজারদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বর্তমানে ১২০ কোটি বাসিন্দা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। সেখানে ইন্টারনেট ইউজারের সংখ্যা ৮৩.৭ কোটি। এটা নয়াদিল্লির সামনে ডিজিটাল পরিষেবা উন্নতি করার রাস্তা খুলে দিয়েছে।









